কাকে দান করবেন ............

 কাকে দান করবেন

শাস্ত্ৰে বলা হয়ে থাকে যে , দানের ফল পরকালে বর্তায়। সাধুকে কিছু দান করলে আত্মকল্যাণ হয় , অসাধুকে কিছু দান করলে নিস্ফল হয় এবং অপাত্ৰে দান করলে অমঙ্গলই লাভ হয়।
এক সাত্বিক সাধু ব্যাক্তি যিনি সারাজীবন বৈদিক বিধান অনুযায়ী সাধন-ভজন করে দিনানিপাত করেছেন। একদিন প্রচন্ড শীতে মন্দিরের বাহিরে কিছু বাজার করতে গিয়েছিলেন।
হটাৎ তিনি দেখলেন এক ভিখারী প্রচন্ড শীতে কাপছিল আর বলতে ছিল, ''কেউ আমাকে একটি কম্বল দিন''।
সাধুর দয়া হল এবং সেই ভিখারীকে কম্বল কিনার জন্য দুইশত টাকা দান করলেন।
কয়েক বছর পর সেই সাধুর মৃত্যু হলে তিনি দেখতে পেলেন যে, তার সুক্ষ্ণদেহ স্বর্গের পরিবর্তে তাকে যমালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পরদিন যখন চিত্রগুপ্তের নিকট হাজির করা হল তখন সাধু চিৎকার করে এর প্রতিবাদ করতে লাগল যে, ভুল করে তাকে যমালয়ে আনা হয়েছে। কারন তিনি মর্ত্যে কখনও পাপ করেন নি।
তখন চিত্রগুপ্ত ভাল করে সাধুর কৃতকর্ম ফল দেখলেন এবং বললেন যে, ''আপনি কয়েক লক্ষ জীবের হত্যার দায়ে পাপীষ্ট হয়েছেন''।
কিন্তু সাধু প্রতিবাদ করতে লাগল। চিত্রগুপ্ত ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন এবং সাধুকে বললেন যে, ''আপনি এক সাধারন ব্যাক্তিকে কিছু অর্থ দান করেছিলেন। সে সেই অর্থ দিয়ে জাল কিনে মৎস শিকার করে জীবন নির্বাহ করছে। এবং তার প্রানী হত্যার অর্ধেক পাপের ভাগ আপনার নিতে হচ্ছে''।
তখন সাধু বুঝতে পারল যে, সেই প্রচন্ড শীতে ভিখারীটি কম্বল না কিনে মাছ ধরার জাল কিনেছিল। এবং সাধু অপাত্রে দান করে নিজের পুন্যজীবন ধ্বংস করেছে।
শ্ৰীমদ্ভগবদগীতায় পরমেশ্বর ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণ বলছেন, ''যদি কিছু প্রীতিপূৰ্ণভাবে দান করতে চাও, তবে আমাকেই দান কর''।
''দদাসি যৎ . . . . তৎ মদপণম্‌'' গীতা ৯/২৭
''তোমার দানের বস্তু আমার প্রতি অৰ্পণ কর''।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১৭তম অধ্যায় শ্রদ্বাত্রয়-বিভাগ যোগে ২০, ২১ ও ২২নং শ্লোকে দান সম্পৰ্কে ভগবান সুন্দর ভাবে তিন রকমের দানের কথা বলেছেন। যেমন,
কাকে দান করবেন


১) দান করা কৰ্তব্য বলে মনে করে , প্ৰত্যুপকারের আশা না করে উপযুক্ত স্থানে ( মন্দিরে , তীৰ্থে ) , উপযুক্ত সময়ে ( পর্ব বা পবিত্ৰ তিথিতে ) , উপযুক্ত পাত্ৰে ( সন্ন্যাসী ও বৈষ্ণবজনকে ) যে দান করা হয় , তাকে সাত্ত্বিক দান বলে ।
২) প্ৰত্যুপকারের আশা করে , ফল লাভের উদ্দেশ্যে , অনুতাপ সহকারে যে দান করা হয় , সেই দান রাজসিক ।
৩) ইন্দ্ৰিয় তোষণের জন্য , অশুভ স্থানে , অশুভ কালে , অযোগ্য পাত্ৰে যে দান করা হয় , তাকে তামসিক দান বলে ।
মহাভারতে উদ্যোগ পর্বে মহামতি বিদুর ধৃতরাষ্টকে বলছেন, ''ছয় রকম ব্যক্তিকে কিছুই দান করা বা সেবা করা কৰ্তব্য নয়''।
যেমন,
(১) আততায়ী ( গৃহদাহকারী , বিষপ্ৰয়োগকারী , ভূমি-দার-অৰ্থাদি অপহরণকারী প্ৰাণনাশাদি অনিষ্ট সাধনে যে তৎপর ) ,
( ২ ) অতি প্ৰমাদী , ( ৩ ) স্নেহশূনা , ( ৪ ) নিয়ত মিথ্যাবাদী , ( ৫ ) ভগবদ্‌ভক্তি শূন্য , ( ৬ ) নিপুণমন্য বা আত্মগড়িমাকারী ।
শ্ৰীবিদুর আরও বলেছেন , নয় ধরনের ব্যক্তির কাছে কিছু দান গ্রহণ বা ভিক্ষা করা উচিত নয় যেমন,
( ১ ) কৃপণ ( কাউকে কিছুই দান করতে চায় না ) ,
( ২ ) শাপদ ( কথায় কথ অভিশাপ দিয়ে থাকে ) ,
( ৩ ) মুর্খ ( দান করে অনুশোচনা করে ) ,
( ৪ ) ধূৰ্ত ( দানের ছলে অসৎ অভিসন্ধি পোষণ করে ) ,
( ৫ ) কৈবৰ্ত ( জীবহত্যাকারী তথা নিম্নশ্রেণীর লোক)
( ৬ ) মানী ব্যক্তির অবমন্তা ( সন্মানীয় ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করে ) ,
( ৭ ) শত্ৰুভাবাপন্ন , এবং
( ৯ ) কৃতঘ্ন( বিশ্বাসঘাতক ) —
এই নয় ধরনের ব্যাক্তির কাছে ভিক্ষা করা উচিত নয় ।
মহাভারতে উদ্যোগপর্বে আরও বলা হয়েছে যে,
যার ক্ৰোধ নেই ,
পাথর ও সোনাতে যাঁর সমজ্ঞান ,
যাঁর শোক নেই ,
সন্ধি ও বিগ্ৰহ ( কলহ) নেই ,
নিন্দা ও প্ৰশংসায় যিনি উপেক্ষা প্ৰদৰ্শন করেন ,
উদাসীনের মতো যিনি
প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয় পরিত্যাগ করেন।
সেই ভিক্ষুককে দান করা গৃহস্থের একান্ত কর্ম।
শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অনুমোদিত হয়েছে যে, যে কোন কর্ম করা হোক না কেন তা যেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্য করা হয়।
তাই তপস্যা, দান ও যজ্ঞ অনুষ্ঠান যদি কেহ কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে করেন তবে তিনি (যমালয় নয়)ভগবানের নিত্যধামে নিঃসন্দেহে ফিরে যাবেন। ভগবানের উদ্দেশ্যে কর্ম অপ্রাকৃত তা কখনও ক্ষয় বা বিফলে যায় না।।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জগন্নাথ দেবের মূর্তিতে কেন হাত নেই?জেনে নিন আসল কাহিনী.......

সনাতন সৃষ্টিতত্ত্ব

একটি ধনী ব্যক্তির গল্প